সাদা-নীলাভ চীনামাটির পাহাড় বিরিশিরি

যদি আপনি ভ্রমনে একই সাথে পাহাড় ও লেক চান তাহলে চট করেই ঘুরে আসুন বিরিশিরি । কেননা, বিরিশিরিতে আপনি শুধু নদী,লেক,পাহাড় নয় বোনাস হিসেবে পাবেন বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম গীর্জা ও হাজং আদিবাসীদের আবাসস্থল ও ভারত-বাংলাদেশ বর্ডারের কিছু অপরুপ দৃশ্য। শান্ত-স্নিগ্ধ, সবুজে মোড়া ছিমছাম পরিবেশ।

বিরিশিরির মূল আকর্ষণ বিজয়পুর চীনামাটির পাহাড় যার বুক চিরে জেগে উঠেছে নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। সাদা মাটি পানির রঙটাকে যেন আরো বেশি গাঢ় করে দিয়েছে। পাহাড় ও সমভূমি সহ এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৬০০ মিটার। শ্বেত শুভ্র চিনামাটির পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে অপরুপ নীলের উৎস সমেশ্বরী নদী। যা বর্তমানে কয়লা খনি হিসেবে পরিচিত। এই নদীর নীল জলে সাদা চিনামাটির পাহাড়ের প্রতিবিম্ব যেন এক অলৌকিক সৌন্দর্যের প্রতীক। এক কথায় অসাধারণ!

 

বিরিশিরি কি কি দেখার আছে

কাশবন আর দূরে আকাশে হেলান দিয়ে গম্ভীর গারো পাহাড়ের ধ্যানমগ্ন প্রতিকৃতি সৌন্দর্যপিপাসুদের মন কেড়ে নেয়। বর্ষায় সোমেশ্বরীর তীরবর্তী বিরিশিরির সৌন্দর্য বেড়ে যায় অনেক গুণ। পাহাড় থেকে নেমে আসা উত্তাল ঢলের রুদ্ধরূপ বর্ষায় বিরিশিরি ঘুরতে আসা পর্যটকদের দেখায় তার বন্য সৌন্দর্য্য।

এছাড়াও দেখার মত আরো রয়েছে রানীখং গির্জা, কমলা রানীর দীঘি এবং সোমেশ্বরী নদী। বিরিশরির পাশেই দূর্গাপুর বাজার। ওই বাজারে পাওয়া যায় নেত্রকোণার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি । ওটা টেস্ট করতে ভুলবেন না।

তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি কমরেড মনি সিংহের স্মৃতিভাস্কর আছে এখানে। রয়েছে পাহাড়ী কালচারাল একাডেমি। পর্যটকদের চাপ বেশী থাকেনা। এখানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় সবাই পাহাড়ী-গারো, হাজং।

পথে যেতে যেতে চোখে পড়বে সেন্ট যোসেফের গির্জা। গির্জাটা বেশ সাজানো-গোছানো, নীরব আর খুব সুন্দর।

এছাড়াও দূর্গাপুর থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তর সীমান্তে পাহাড়ের চুড়ায় রানীখং গীর্জা অবস্থিত। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে বিরিশিরির সৌন্দর্য যেন অন্য মাত্রা পায়।

কমলা রানী দীঘি

বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই কমলা রানী দীঘি। এটি সাগর দীঘি নামেও পরিচিত। দীঘিটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এর দক্ষিণ-পশ্চিম পাড় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

কংস নদী

বিরিশিরি যেতে বাস থেকে নেমে সবার আগে এ নদীটি পার হতে হবে। মাত্র ৫ মিনিট লাগবে। ছবিতে একটি নির্মাণাধীন সেতু দেখতে পাচ্ছেন। সেতুর কাজ শেষ হলে এই ক্ষুদ্র নৌভ্রমণটির আর প্রয়োজন পড়বেনা।

অপরূপ সোমেশ্বরী

বিকেলের রোদহীন কোমল আলোয় সোমেশ্বরীতে নৌভ্রমণ। আহা!

পুটিমারি মিশন

এটি একটি ক্যাথলিক মিশন। এর ভেতেরে যাওয়ার জন্য অনুমতির প্রয়োজন। আমরা অনেক বলে কয়ে শুধু ভেতরটা একটা চক্কর মেরে আসতে পেরেছিলাম।

রাণীক্ষং মিশন

এটিও একটি ক্যাথলিক মিশন। ভেতরটা খুব সুন্দর।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

বাংলাদেশের একমাত্র উপজাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি এখানে অবস্থিত।

চীনা মাটির পাহাড়

বাংলাদেশ ইনসুলেটর এন্ড স্যানিটারি ওয়ার ফ্যাক্টরি লিমিটেড এ জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় চীনা মাটি সংগ্রহ করে।

এছাড়াও অদ্ভুত সুন্দর গোলাপী মাটির পাহাড়, মন জুড়ানো নীল পানির হ্রদ, প্রাচীন সুসং রাজ্যের জমিদার বাড়ি

 

বিরিশিরি যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন:

ঢাকা – ময়মনসিংহ ২২০/-

ময়মনসিংহ – জারিয়া ২০/- (ময়মনসিংহ হতে জারিয়া পর্যন্ত দিনে ৪ বার লোকাল ট্রেন চলাচল করে।সকাল ৬:৩০ টায় , সকাল ১১ টায়, বিকাল ৪ টায় , রাত ৮:৩০ টায়।)

জারিয়া-বিরিশিরি সি.এন.জি ৫০/-(প্রতিজন)

ট্রেনে – ঢাকা থেকে হাওড় এক্সপ্রেস রাত ১১.৫০ মিনিটে ছেড়ে যায়। এই ট্রেনে ভোরের দিকে নামতে হবে শ্যামগঞ্জ ট্রেন স্টেশনে। ওখান থেকে বাস কিংবা সিএনজি করে বিরিশিরি বাজার। ট্রেনে ময়মনসিংহ গিয়েও সেখান থেকে বাসে বিরিশিরি আসতে পারেন।

ঢাকা ফেরার জন্য দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র তালুকদার প্লাজার সামনে থেকে রাত এগারটায় এবং সাড়ে এগারটায় দুটি নাইট কোচ ঢাকার উদ্দ্যশ্যে ছেড়ে যায়। আপনি এখান থেকে টিকিট সংগ্রহ করে বাসে যেতে পারেন। ভোর পাঁচটার মধ্যেই মহাখালী পৌঁছে যাবেন।

বিরিশিরি বাজার থেকে ব্যাটারী রিক্সা ভাড়া করে এই চীনামাটির পাহাড়সহ আরো কয়েকটি দর্শনীয় জায়গা ঘুরে দেখা যাবে। পুরো দিনের জন্য ভাড়া পড়বে ৫০০-৬০০ টাকা । পাচ থেকে ছয়ঘন্টা সময়ের ভিতর উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী, রাণীখং চার্চ, সোমেশ্বরী নদী, গারো পল্লী,কমলা বাগান, চীনামাটির পাহাড় ঘোরা হয়ে যাবে।

খাওয়া দাওয়াঃ

খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা নিয়ে আপনাদের একেবারেই চিন্তা না করলেও চলবে। যে গেস্ট হাউস এ থাকবেন তারাই সুলভ মুল্যে ভাল খাবারের ব্যাবস্থা করে দিবে।

রাস্তার পাশেই ধারে ১০০ রকম চায়ের একটা টং আছে। বিভিন্ন স্বাদের দুই এক কাপ চা খেতে পারেন।

যারা দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসবেন তারা রাতের খাবার খেয়ে বাসে উঠে পরবেন।

 

পুনশ্চ : Industrial Raw material হিসেবে চীনামাটির ব্যবহারের জন্য দিন দিন কেটে ফেলা হচ্ছে এই সাদা-নীলাভ চীনামাটির পাহাড়। অনেকটায় কেটে ফেলা হয়েছে হয়ত এখন থেকে ১০ বছর পর বিজয়পুরের এই চীনামাটির পাহাড়ের কোনো চিহ্ন থাকবে না। তাই সময় থাকতে দেখে ফেলুন