মানবিকতা স্খলনের নেপত্যে কি বৈশ্বিক মহামারি?

অভিমন্যু ভট্টাচার্য্য: অদৃশ্য করোনার ছোবল সন্দেহে গর্ভধারিণী মা কে গহিন বনে (প্রকৃতি মাতার নিকট) রেখে আসা টা কত ভয়ানক অপরাধ সেটা আমার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুধাবন থেকে লেখা। মানব সভ্যতাকে যেন স্খলিত অমানবিক পৈশাচিকতা থাপ্পড় মেরে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরা আমাদের ধর্মে নেই।

“ওঁ শান্তিরূপাং ক্ষমারূপাং স্নেহরূপাং শুভংকরীং।
সাক্ষাৎ ভগবতীদেবীং মাতরং ত্বাং নমাম্যহম্।”

মায়ের চেয়ে আপন আর কেইবা আছে। গর্ভধারিণী, জন্মদাত্রী হিসেবে সবার ওপরে সকলের জীবনে মায়ের স্থান।

সনাতন ধর্মে-মা, মা আর মা; সর্বক্ষেত্রেই মায়ের জয়জয়কার। তুলনাহীনা, অমূল্য সম্পদ গর্ভধারিণী জননী বা মা।

পবিত্র আল-কুরআনে উদ্ধৃতি পাওয়া যায়-
“যে গর্ভ তোমাকে ধারণ করেছে সে গর্ভধারিণী মায়ের প্রতি তুমি কর্তব্য পালন করো এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করো।”

উপনিষদে পড়েছিলাম, ‘‘মাতৃ দেব ভব”। অর্থাৎ- মা দেবী স্বরূপিনী, জীবন্ত ঈশ্বরী৷ তাছাড়া সনাতমধর্মে মহাশক্তি, আদিশক্তি, রক্ষাকর্ত্রীর ভূমিকায় আমরা যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের কিন্তু আমরা মাতৃরূপেই চিনেছি৷ এ জন্য কুসন্তান বলা হলেও, কুমাতা কখনও বলা হয় না৷

একি ভাবে- ইসলাম ধর্মের অনেক স্থানে মা-বাবার স্থানকে বিশেষ স্থানে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
কোরআন কারিমে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। (সুরা বনি ইসরাইল :২৩)। ইমাম কুরতুবি (রা.) বলেন, এ আয়াতে আল্লাহপাক পিতা-মাতার সম্মান ও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সঙ্গে বর্ণনা করে সন্তানের ওপর তা অপরিহার্য করেছেন।
আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা যেমন অতি জরুরি, অনুরূপভাবে পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করাও সন্তানের জন্য জরুরি (তাফসিরে কুরতুগি ৫/৫৭৫)।

শ্রী শ্রী চণ্ডীতে স্তব মন্ত্রে বলা হয়েছে –
“যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা”।
সুতরা সনাতনে যে মা এর স্থান জীবনাদর্শের অনন্যস্থানে স্থিতধী।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- তাঁর “ মনে পরা ” নামক কবিতার শেষাংশে লিখেছেন-

“মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে শোবার ঘরের কোণে,
জানলা দিয়ে তাকাই দূরে নীল আকাশের দিকে-
মনে হয় মা আমার পানে চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধ’রে কবে দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে সারা আকাশ ছেয়ে।”

কালীদাস তাঁর- “ মাতৃভক্তি ” কবিতায় লিখেছেন

“কহিল জননী,’নয়নের মণি, সাধারণ শিশু নও,
খোদার দোয়ার বরকতে তুমি জগতপূজ্য হও।
পুত্র গরবে গর্বিত বুকে,খোদা, স্মরি তব নাম,
তোমারে আমার জীবনের এই সম্বল সঁপিলাম।
বিফল হয়নি মায়ের আশিস, হৃদয়ের প্রার্থনা
জগৎ-বন্দ্য জ্ঞানগুরুদের বায়েজিদ একজনা।”

সত্যিকথা বলতে বিশ্ব মানব সভ্যতায় মাকে নিয়ে অনেক জয়গান আছে পুথিগিত ভাবে। কিন্তু আমাদের আদর্শে সেটা কতটুকু তা প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা বিশ্ব দরবারে এখন অগনিত বৃদ্ধাশ্রম আর সেটা শুধুই কিছু সংখ্যক মা বাবাদের জীবনের শেষাংশের ঠিকানা।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এর একটি শ্রেষ্ঠ উক্তি বিশ্বমানব সভ্যতার কাছে সমাদৃত –
“তুমি আমাকে শিক্ষিতা মা দাও আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতী দেবো ”

আব্রাহাম লিংকন মাতৃজয়গানে উল্লেখ করেছে-
“যার মা আছে সে গরীব নয়”

বাংলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব হুময়ূন আহমেদ বলেছেন-
“মা হলেন পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক যেখানে আমরা সমস্ত দূঃখ,কষ্ট জমা রাখি এবং তার বিনিময়ে বিনাসুদে গ্রহন করি অকৃত্রিম ভালবাসা।”

জর্জ ওয়াশিংটন এর মাতৃবন্দনাবাক্য-
“আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা হলেন আমার মা। মায়ের কাছে আমি চিরঋণী। আমার জীবনের সমস্ত অর্জন তারই কাছ থেকে
পাওয়া নৈতিকতা, বুদ্ধিমত্তা আর শারিরীক শিক্ষার ফল।”

জোয়ান হেরিস বলেন-

“সন্তানেরা ধারালো চাকুর মত। তারা না চাইলেও মায়েদের কষ্ট দেয়।আর মায়েরা তাদের
শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত সন্তানদের সাথে লেগে থাকে।”

এলেন ডে জেনেরিস এর মাতৃবন্দনা এই রূপ-
“আমার বসার ঘরের দেয়ালে আমার মায়ের ছবি টাঙানো আছে, কারণ তিনিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।”

মা- নিয়ে সারা জীবন লিখলে সেই লেখার মন্তব্য পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ করা অসম্ভব-

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম “ মা ” নামক কবিতায় মাতৃবন্দনা করেছেন অসাধারণ ছন্দে-
যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনখানে কেহ পাইবে ভাই!

হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।

কামিনী রায়ের মাতৃবন্দনার আবেগময় বাক্য বিস্তার যে কোন মা-সন্তানের আবেগ কে জাগিয়ে তুলে-

“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”

“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”

“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!

অদৃশ্য বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে গর্ভধারিণী মা কে তার সন্তান রা গভীর জঙ্গলে ফেলে আসার ঘটনা টা জঘন্যতম অমানবিক আচরণ। যা যে কোন সভ্য মানুষের হৃদয়কে অশান্ত করে তুলবে। ঠিক তদ্রুপ আমার হৃদয়কে ও অশান্ত করে তুলেছে।

‘মা, তুমি এই বনে এক রাত থাকো। কাল এসে তোমাকে নিয়ে যাব’—এ কথা বলে ৫০ বছর বয়সী মাকে শাল-গজারির বনে ফেলে যান তাঁর সন্তানেরা। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সন্তানেরা এমনটা করেন। পরে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে উপজেলা প্রশাসন তাঁকে বন থেকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠায়।গত সোমবার এই ঘটনাটি ঘটে।

এই ব্যাপারে অদ্য ১৬- এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ঢাকা বিভাগের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে গণপ্রাজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও দূঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান-
করোনা ভাইরাস নিয়ে অমানবিকতার কোনো যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মায়ের একটু সর্দি-কাশি-জ্বর দেখে জঙ্গলে ফেলে আসা; এর চেয়ে অমানবিক কাজ আর হতে পারে না। এই অমানবিক হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারও যদি সন্দেহ হয়, তাহলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

মায়ের প্রতি এ কেমন প্রতিদান? সভ্যতার এ কেমন বিচার? নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে বিশ্ব বিবেকবান দের। ধীক ধীক- বিশ্ব ধরিত্রীর বিবেকহীন সন্তান দের।

যারা এই ন্যাক্কারজনক কাজ করলো তাদের কি বিচার করা হয় সেইদিকে তাকিয়ে আছি আমরা। এমন আচরণ তো পশুদের থেকে আশা করা অসম্ভব।

কিছুদিন পূর্বে টেলিভিশন এর আশির্বাদে একটি ফুটেজ দেখেছিলাম- সেখান একটি মাংসাশী তথা ক্ষুধার্ত সিংহ খাদ্যের সন্ধানে গহিন বনে বের হয়। সারাদিন ঘুরে একটি সদ্যোজাত হরিণ বাচ্চা সহ হরিণি কে পায়। কিন্তু বাচ্চা জন্মলগ্নে মা হরিণী মারা যায়। হিংস্র সেই সিংহ এই নবজাতক বাচ্চা হরিণ কে তৎক্ষনাৎ মাতৃস্নেহ দিতে থাকে।

কিন্তু করোনা ভাইরাস সন্দেহের ফলে গর্ভধারিণী মাকে বনে ফেলে আসা যেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অসভ্যতা,নিকৃষ্টতা,অমানবিক, দুরাচারীতা। সভ্যতার এই কলঙ্কিত দের ফাঁসিতে ঝুলাইয়া মারলেও কম হবে। এরা এই প্রকৃতির জন্য অভিশাপ।মৃত্যুর পর এদের কে মাটিতে রাখলে সেই মাটিও তাদের অস্বীকার করবে। কেননা এই মাটি ও মাতৃস্বরূপা।

এই স্থলে আমার মনে হচ্ছে
বিশ্বের অন্যতম কৌটিল্য/নীতি শাস্ত্রাকার পণ্ডিত চানক্য(পক্ষিল) এর উক্তি –
“ একেনাপি কুবৃক্ষেণ কোটরস্থেন বহ্নিনা।
দহ্যতে তদ্বনং সর্বং কুপুত্রেণ কুলং যথা।।”

অর্থাৎ : যেমন একটিমাত্র কুবৃক্ষের কোটরের আগুনের দ্বারা সেই সমগ্র বন দগ্ধ হয়, তেমনি একটিমাত্র কুপুত্রের দ্বারা সমগ্র কুল কলঙ্কিত হয়।

আমার মনে হয় কুল কথাটা ও আজ এখানে অকাট্য কারণ এই অপরাধীর অপিরাধ সভ্যতাকে কলঙ্কিত করেছে। তাই সভ্যতার একজন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সদস্য হিসেবে নিজেকে অপিরাধী মনে হয়।

হে বিশ্ব ধরিত্রী,হে বিশ্ব জননী ক্ষমা করে দাও আমাদের।

পরিশেষে বিদ্রোহী কবির কণ্ঠের ধ্বনি পূনরায় বন্দনায় শেষ করতে চাই আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস-

দিবানিশি ভাবনা
কিসে ক্লেশ পাব না,
কিসে সে মানুষ হব, বড় হব কিসে;
বুক ভ’রে ওঠে মা’র
ছেলেরি গরবে তাঁর,
সব দুখ হয় মায়ের আশিসে।

আয় তবে ভাই বোন,
আয় সবে আয় শোন
গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা’র;

মা’র বড় কেহ নাই-
কেউ নাই কেউ নাই!
নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা আমার!

সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে সত্যি মানসিক ভাবে খুব বিপর্যস্ত এই অবক্ষয়ের থেকে আদৌকি আমরা রক্ষা পাবো? মানুষের মনুষ্যত্ব যেখানে হিংস্র মাংসাশী সিংহের স্বভাবকে ও হার মানায় সেখানে সভ্যতার বিবেকবান না নির্বাকচিত্তে তাকিয়ে আছেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে। হতবাক হচ্ছি সভ্যতার স্তব্ধীকৃত নিরবতা দেখে।

সবাই ভাল থাকুন- ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।

অভিমন্যু ভট্টাচার্য্য, সহঃম্যানেজার, মাজিম এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রি লিঃ