অগ্নিঝরা মার্চ: উল্লাপাড়াতেও পালিত হয় শোক দিবস; শুরু হয় লাগাতার হরতাল

আলমগীর হোসেন আলমঃ ৭১ এর ১ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত অধিবেশন সামরিক শাসক জেনারল ইয়াহিয়া খান স্থগিত ঘোষনা করলে আওয়ামীলীগ ২ মার্চ সারাদেশে হরতারের ডাক দেয়া। উল্লাপাড়ার সর্বত্র এই হরতাল পালিত হয়।

হরতালের সমর্থনে দলে দলে মানুষ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাজপথে মুহুর্মুহু শ্লোগান দেয়। ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশের মতো উল্লাপাড়ায়ও অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়।

৩ মার্চ উল্লাপাড়া সহ সারাদেশে পালিত হয় শোক দিবস। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐহিহাসিক ঘোষনা ৮ মার্চ রেডিওতে প্রচারিত হওয়ার পর উল্লাপাড়ার মুক্তি পাগল মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। থানা সদর সহ বিভিন্ন ইউনিয়নে শোভা সমাবেশ আর বিক্ষোভ মিছিল একটানা চলতে থাকে।

সব কয়টি ইউনিয়নেই গঠন করা হয় সংগ্রাম পরিষদ। উল্লাপাড়ায় সংগ্রাম পরিষদে নেতৃত্বে ছিলেন এ্যাডঃ গোলাম হাছনায়েন এমপিএ,কৃষক নেতা প্রয়ত অমুল্য লাহিড়ী, মরহুম সাইদুর রহমান,মরহুম জয়নাল আবেদীন,খন্দকার মিজানুর রহমান ও আব্দুল লতিফ মির্জা প্রমুখ।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দেন মরহুম গিয়াস উদ্দিন,আলমগীর,আঃ সাত্তার,জয় চন্দ সাহা প্রমুখ। মার্চের ২ সপ্তাহ থেকে ততকালীন পার্কমাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বাঁশের লাঠি, কাঠের রাইফেল ( ড্যামি) নিয়ে ছাত্র যুবক এই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়।

অগ্নিঝরা মার্চের ১৬ তারিখে থানা ভবন থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করা হয় গাড় সবুজ ও লাল বৃত্তের মধ্যে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। থানা থেকে লুট করা রাইফেল দিয়ে গঠন করা ৩০-৪০ জনের প্রতিরোধ বাহিনী। মহকুমা শহর সিরাজগঞ্জ ও জেলা শহর বগুড়ার সঙ্গে উল্লাপাড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রথম দিকেই সিরাজগঞ্জের সঙ্গে রেল এবং বগুড়ার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছন্ন করে দেয়া হয়।

ভয়াল ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট এর নামে চলে গণহত্যা।৭১ সালে এই দিনে মধ্যরাতে হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের নীল নকশা অনুযায়ী রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে নিরস্র বাঙ্গালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন নাশ হয়েছিলো।

পাকিস্তানি বাহিনী যে হত্যাযোগ্য চালায় তার খবর উল্লাপাড়ায় পৌছানোর পর সংগ্রাম পরিষদের নেতারা উল্লাপাড়া টাউন ক্লাবকে সংগ্রাম পরিষদের কার্যলয় হিসেবে ব্যবহার করে। সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনী যাতে ডুকতে না পারে সে জন্য প্রথম থেকে উল্লাপাড়ায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সিরাজগঞ্জে ততকালীন এসডিও শহীদ শাসসুদ্দিন আহম্মদ এই সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৮ এপ্রিল ঢাকা থেকে পাকিস্তানি বাহিনী একটি শক্তিশালী দল নগরবাড়ী ঘাট হয়ে উল্লাপাড়ায় দিকে আসার পথে বাঘাবাড়ীর কাছে মুক্তিবাহিনী দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হন। মুক্তিবাহিনীর ৩০-৪০ জনের একটি দল হানাদার বাহিনীকে বাধা দেয়। এই বাহিনীতে ছিলেন,আঃ লতিফ মির্জা, লুৎফর রহমান,খোরশেদ আলম,আব্দুস সামাদ মিয়া সহ ইপিআর ও পুলিশের সদস্য।

একটি এলএমজি ও ৩০-৩৫ টি ৩০৩ রাইফেল ছিলো এই বাহিনীর কাছে। একটানা ২ দিন বাঘাবাড়ীতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ হয় মুক্তিবাহিনীর । ২০ এপ্রিল খবর আসে ঈশ্বরদী থেকে ট্রেনযোগে পাকিস্তানি বাহিনী সিরাজগঞ্জের আসছে। রাতেই বাঘাবাড়ী থেকে মুক্তিবাহিনীর দলটি উল্লাপাড়া ঘাটিনা রেল সেতুর কাছে অবস্থান নেয়। তার অনেক আগেই সেতুর কাছে প্রায় ৪০০ গজ রেললাইন তুলে ফেলা হয়।

২১ এপ্রিল দুপুরে পাকিস্তানি বাহিনী ঘাটিনা রেল সেতুর কাছে পৌছে রেললাইন সংস্কারের জন্য ট্রেন থেকে নামা মাত্র মুক্তিবাহিনীর হাতিয়ার গর্জে ওঠে। মুক্তিবাহিনীর বুলেটের আঘাতে এ সময় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা খতম হয়। পরে ট্রেন নিয়ে পাকহানাদার বাহিনী পিছু হটে যায়।

২২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী ২ দিক থেকে আক্রমন চালায় উল্লাপাড়ার উপর। তারা ঘাটিনা রেলসেতু ও পরে রেল ষ্টেশন এলাকায় মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের উপর বাঘাবাড়ী থেকে ব্যাপক মর্টার সেলিং করে। ওই দিন মুক্তিবাহিনী উল্লাপাড়া ছেড়ে সিরাজগঞ্জের দিকে চলে যায়।

২৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনী বাঘাবাড়ী থেকে সড়ক পথে এবং ঈশ্বরদী থেকে ট্রেন যোগে উল্লাপাড়ায় প্রবেশ করে। ২৫ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ রোড় চৌরাস্তার মোড়ের দক্ষিন পাশে চড়িয়া শিকার গ্রামের কালিবাড়ীতে হানাদার বাহিনী ডুকে নির্বিচারে হত্যাযোগ্য চালায়।

এর পর পাকিস্তানি বাহিনী এদেশীয় দোষর আলবদর,আল-সামস ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে উল্লাপাড়ার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ক্যাম্প স্থাপন করে তাদের তান্ডব নিলা চালায়। বঙ্গবন্ধুর ঐহিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষনা প্রকাশিত হলে মুক্তি পাগল বাঙ্গালীরা তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেওয়ার জন্য ভারতে যায় প্রশিক্ষণ নিতে ও গোলা বারদ আনতে।

ঐতিহাসিক ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে অঙ্গীকার হওয়া উচিত সুখি ও সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়ার এবং শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গিকার।